ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০১৫ উদযাপন

‘নারীর ক্ষমতায়ন -মানবতার উন্নয়ন’ – এই শ্লোগানকে সামনে রেখে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম-এর উদ্যোগে উদ্যাপিত হলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০১৫। এ উপলক্ষে আজ ০৭ মার্চ, ২০১৫ সকাল ৮.৪৫টায় জাতীয় জাদুঘর, শাহবাগ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিতে বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, ফোরাম-এর সদস্য, শিক্ষক, অভিভাবক এবং বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীসহ প্রায় ৪৫০ জন স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় বেলুন উড়িয়ে র‌্যালির উদ্বোধন করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব মেহের আফরোজ চুমকি এমপি। র‌্যালিটি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, (রমনা, ঢাকা) পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়। র‌্যালি শেষে সকাল ১০.০০টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট-এর সেমিনার রুমে আলোচনা সভা, সম্মাননা প্রদান, ‘নারীর কথা-১০’ নামক জার্নাল এর মোড়ক উম্মোচন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

আলোচনা সভায় মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব মেহের আফরোজ চুমকি এমপি ছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- অধ্যাপক মাহমুদা ইসলাম- সাবেক প্রেসিডেন্ট, উইমেন ফর উইমেন ও অধ্যাপক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, কলেজ অব লিবারেল, ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস, বোস্টন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জনাব হালিদা হান্ম আক্তার- প্রধান, ইউএসএআইডি-ডিএফআইডি এনজিও হেলথ সার্ভিস ডেলিভারি প্রজেক্ট (এনএইচএসডিপি)। সম্মানিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- জনাব নাছিমা আক্তার জলি- সম্পাদক, জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম, জনাব শাহিন আক্তার ডলি- নির্বাহী পরিচালক, নারীমৈত্রী এবং জনাব ওয়াহিদা বানু- নির্বাহী পরিচালক, অপরাজেয় বাংলাদেশ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম-এর সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার।

NGCAFপ্রধান অতিথির বক্তব্যে মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ‘দেশকে এগিয়ে নিতে হলে নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য নারীদের আত্মবিশ্বাসী হয়ে  শিক্ষিত ও যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। একইসঙ্গে তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারও নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী। এ লক্ষ্যে নারী নির্যাতন রোধে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, ৪০টি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডারবান্ধব নীতি প্রণয়ন করা, নারীদের উন্নয়নে ২১টি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ১২১টি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি নেয়া হয়েছে এবং ১৫ হাজার নারীকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দায়িত্ব পেলে নারীরাও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারে তা আজ প্রমাণিত।’ নারীদের এগিয়ে যাওয়ার এ ধারা অব্যাহত থাকলে তাদের কেউ দমিয়ে রাখতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এর আগে স্বাগত বক্তব্যে ফোরাম-এর সম্পাদক নাছিমা আক্তার জলি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের ১০৫ বছরের অতিক্রান্ত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অগ্রগতি পরিলক্ষিত হলেও শতাংশের হারে তা অত্যন্ত কম। তাই নারীর ক্ষমতায়ন আরও দৃশ্যমান করতে হবে এবং নারীকে মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সকল স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং সম্পদ ও সম্পত্তিতে নারীর সম-অধিকার নিশ্চিত করা দরকার। একইসঙ্গে দরকার ‘নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১’ দ্রুত বাস্তবায়নে যে কর্মকৌশল গ্রহণ করা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করা।’

অধ্যাপক মাহমুদা ইসলাম বলেন, ‘বেইজিং ঘোষণার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এর ওপর আলোকপাত করে আমরা পালন করছি আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ১৯৯৫ সালে ১৮৯টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বেইজিং সম্মেলনে নারীর ক্ষমতায়নের ওপর দলিল গ্রহণ করা হয় তাই বেইজিং ঘোষণা।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে নারীর ওপর নির্যাতন বন্ধ করে তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে অনেক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, দরকার এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন। আমরা চাই, নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ। এজন্য আমাদের সমাজে বিরাজমান পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের ভাবতে হবে যে, আমরা প্রথমত নারী, তারপর মানুষ।’

হালিদা হানম আক্তার বলেন, ‘রাজনীতি-সহ দেশের সবক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। এজন্য নারীদেরকে তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে হবে। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। কারণ বাল্যবিবাহের শিকার হওয়া নারীরা অপরিণত বয়সে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।’

শাহীন আক্তার ডলি বলেন, ‘১৯৭১ সালের এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন- “এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম…”। আমি বলবো- এবারের সংগ্রাম বাংলাদেশে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। কারণ নারীর ক্ষমতায়ন মানেই মানবাধিকারের জয়। এজন্য আমাদের সবাইকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হতে হবে।’

ওয়াহিদা বানু বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৪ বছরে বাংলাদেশে নারীদের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। নারীরা যদি তাদের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে তাহলে এ অর্জন আরও দৃশ্যমান হবে।’ তিনি বলেন, ‘নারী নির্যাতন বন্ধে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। যাতে নারীরা উপযুক্ত সেবা পায়। নারী দিবসে আমাদের এই হোক অঙ্গীকার- পৃথিবীর বুকে আমরাই গড়ে তুলবো প্রথম নারীবান্ধব রাষ্ট্র।’

সভাপতির বক্তব্যে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্সে দেয়া বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো। এ ঐতিহাসিক দিনেই আমরা পালন করছি আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আজকের দিনে আমাদের ঘোষণা হবে- বাংলাদেশে আমরা নারীর অধিকার নিশ্চিত করবোই। কারণ আমরা মনে করি, নারীর উন্নয়ন মানেই দেশের তথা মানবতার উন্নয়ন।’

অনুষ্ঠানের বিশেষ পর্বে নারীর কথা-১০ জার্নাল (নির্বাচিত নারী জনপ্রতিনিধিদের সফলতার গল্প) এবং পোস্টার-এর মোড়ক উন্মোচনও করা হয় এবং মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজ পরিবর্তনের রুপকার কৃষ্ণা রহমান এবং তৃণমূলের (রংপুর) নারী সংগঠক এবং জীবনমানের পরিবর্তনকারী নারীনেত্রী মনোয়ারা বেগম-কে  সম্মাননা প্রদান করা হয়। তাঁদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি।

সম্মাননা পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে কৃষ্ণা রহমান বলেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ৭ই মার্চে এই সম্মাননা পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।’ এ সময় তিনি শ্লোগানের স্বরে বলেন,
“নারী, নারী এবং নারী,
সবই করতে পারি।
রাষ্ট্র এবং পরিবারে
সমান হবো সম-অধিকারে।”

মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমি সম্মাননা পেয়ে খুবই আনন্দিত। এক সময় ছিল যখন আমি দু বেলা ভাত খেতে পারতাম না। আজকে আমরা সংঘবদ্ধ হয়েছি। নিজেদের যোগ্যতাবলে স্বাবলম্বিতা অর্জন করেছি। এক সময় আমি অন্যদের কাছে টাকা ধার নিতাম। এখন লোকজন আমাদের কাছে টাকা চাইতে আসে।’ এ সময় তিনি তাঁর বক্তব্যে সমাজ উন্নয়নমূলক কাজকে এগিয়ে নেয়ার জন্য ভবিষ্যতে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদে প্রার্থী হতে চান বলেও জানান।