ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন

৭ ডিসেম্বর, ২০১৯, এল,জি,ই,ডি মিলনায়তন, আগার গাঁও, ঢাকা, বাংলাদেশ
আমাদের অঙ্গীকার
আমরা, তৃণমূলের সহস্রাধিক নারী সংগঠক, যারা বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর সদস্য, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আজ ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ ঢাকায় সমবেত হয়েছি। আমরা ইতোমধ্যে নিজ এলাকায় আমাদের, বিশেষ করে নারীদের জীবনমানের উনয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এখানে একত্রিত হয়েছি আমাদের সফলতাগুলো উদ্যাপন, সংগ্রামের অভিজ্ঞতাগুলো বিনিময় এবং একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে।

আমরা জানি যে, প্রসূতি মা ও নবজাতক শিশুর মৃত্যুহার কমানো, টিকাদানসহ শিশুদের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর অংশগ্রহণ এবং তাদের সার্বিক জীবনমানের উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি যথেষ্ট ইতিবাচক। কিন্তু একইসঙ্গে আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, সারা দেশে নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি সহিংসতা ব্যাপক হারে বেড়েই চলেছে। ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই নয় মাসে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন বাংলাদেশের ১ হাজার ১৩০ জন নারী ও ১ হাজার ১ জন শিশু। শিশু বিবাহের হারও বাংলাদেশে ব্যাপক। এছাড়াও বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক নারী ও কন্যাশিশু  ক্ষুধা, অপুষ্টি ও পাচারের শিকার। সমাজের বিভিন্ন স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সুযোগ ও মৌলিক সেবা গ্রহণে নারীদের অভিগম্যতা ও সম-অংশগ্রহণের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। আমরা এই সম্মেলন থেকে এ সকল অন্যায্য ও অমানবিক অবস্থা অবসানের লক্ষ্যে এবং নারী তথা সকল নাগরিকের জন্য সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যত জীবন গঠনে আমরা দৃঢ় অংগীকার ব্যক্ত করছি।

আমরা এমন একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, যেখানে সমাজের প্রতিটি স্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় থাকবে নারীর অন্তর্ভুক্তি ও সম-অংশগ্রহণ। সকলের জীবন হবে নিরাপদ। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের, বিশেষত নারীদের সচেতন, সক্রিয় ও সংগঠিত করে তাদের অর্ন্তর্নিহিত  ক্ষমতা ও সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে আমাদের বহুল প্রত্যাশিত আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যৎ অর্জন করা সম্ভব। এই প্রত্যাশাকে ধারণ করে, তৃণমূলে নারী নেতৃত্ব বিকাশের মাধ্যমে আমরা যে গণজাগরণ সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছি তা বেগবান করার লক্ষ্যে এই সম্মেলন থেকে আমরা কতকগুলো কর্মসূচি স্বেচ্ছায় বাস্তবায়নের ঘোষণা  দিচ্ছি যে,

এক. বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর একনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে আমরা প্রত্যেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে নিজেদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও অর্ন্তর্নিহিত শক্তির সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটাবো, যাতে ক্ষুধামুক্ত ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনে আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়ে উঠি;

দুই. সমমনা অন্য নারীদের সংগঠিত ও তাদের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করবো, যাতে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ককে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী প্লাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা যায়। এই নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করার জন্য পিছিয়ে পড়া নারীদের নিয়ে স্থানীয় নারী সংগঠন গড়ে তুলবো এবং তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করবো;

তিন. গণতন্ত্র, সুশাসন ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার একটি অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। তাই স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সকল স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। সকল স্তরের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে নিজেদেরকে প্রস্তুত করে তুলবো। একইসঙ্গে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীগণ যাতে নির্বাচিত হন, সে লক্ষ্যে জনগণ, বিশেষত নারীদের সংগঠিত ও উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবো;

চার. আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে বাল্যবিবাহ, যৌতুক, নারী ও শিশুপাচার এবং পারিবারিক নির্যাতন-সহ নারীর প্রতি সকল সহিংসতার বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়াবো। বিশেষ করে ১৮ বছরের আগে যাতে কোনো কন্যাশিশুর বিয়ে না হয় তার জন্য সর্বোচ্চ প্রচার-প্রচারণা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলবো।

পাঁচ. ক্ষুধা-দারিদ্র্যের অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন, পরিবেশবান্ধব কৃষি আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়া এবং নারীরা যাতে সঠিক তথ্য না জেনে আর্থিক স্বাবলম্বিতার প্রলোভন চক্রে জড়িয়ে দেশে-বিদেশে যৌন হয়রানীসহ যে কোনো ধরনের নির্য়াতনের শিকার না হয়, এজন্য আমরা নিজ নিজ এলাকায় সামাজিক গণজাগরণ গড়ে তুলবো;

ছয় : সরকারের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রের কাছ খেকে প্রাপ্য সম্পদ, সেবা ও ন্যায্য অধিকারসমূহ জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে  ইউনিয়ন পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি ও মৌলিক সেবায় নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা নিশ্চিতকল্পে ইউনিয়ন পরিষদ-সহ অন্যান্য সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহে জোরালো প্রচেষ্টা চালিয়ে যারো;

সাত. সার্বিক জীবনমান উন্নয়নে স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ও নিরাপদ পানি, গর্ভবতী নারীর যতœ ও নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রতিটি শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তি, জন্ম ও বিবাহনিবন্ধন, আত্মকর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ, নারী শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য দূরীকরণ এবং মাদক ও জঙ্গিবাদের মতো ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা দূরীকরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবো;

আট. কন্যাশিশু বোঝা নয়, বরং সম্পদ Ñ এ বোধ গড়ে তোলার ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবো, যাতে করে জন্মের পর থেকেই কন্যাশিশ্রু সকল সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত হয়। একইসঙ্গে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া রোধ করা-সহ কন্যাশিশুর সকল অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের প্রতিভা বিকাশের সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলবো;

নয়. বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর সদস্য হিসেবে আমরা নিজ নিজ এলাকায় জাতীয় ও আর্ন্তর্জাতিক দিবসসমূহ উদ্যাপনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবো। বিশেষত আর্ন্তর্জাতিক নারী দিবস, জাতীয় কন্যাশিশু দিবস, আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস, বিশ্ব মানবাধিকার দিবস ও বেগম রোকেয়া দিবস অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করবো;

দশ: জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত এসডিজির ১৭টি অভীষ্টসমূহের স্থানীয়করনের অর্জনে সরকারি-  বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহর সাথে  এবং তৃণমূলে উজ্জীবিত, সংঠিত  নারী-পূরুস ও যুবাদের নিয়ে একত্রে কাজ করবো;

পরিশেষে, আজকের এ সম্মেলন থেকে আমরা দীপ্তকণ্ঠে প্রতিশ্র“তি ব্যক্ত করছি যে, সকল প্রকার বৈষম্য-নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে মুক্ত একটি মানবিক মর্যাদার সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.