উদ্ভব ও বিকাশ

পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সকল সমাজেই নারী চরম শোষণ ও লাঞ্চনার শিকার হয়েছে। শোষিত ও বঞ্চিত মানুষ চিরকাল নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিদ্রোহ করেছে। নারীর ক্ষেত্রে তেমন সংগঠিত বিদ্রোহের ঘটনা দেখা যায়নি বহুকাল ধরে। এটা ইতিহাসের ব্যতিক্রম। পুরুষতন্ত্র কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া নারীর ওপর পুরুষের অন্যায় কর্তৃত্ব,আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ মেনে নিয়ে,কখনো বা মনে নিয়েই নারীরা চিরকাল মানব সভ্যতাকে বহমান রাখার গুরুদায়িত্ব পালন করে গেছে। পাশাপাশি পুরুষও পরিবার ও সমাজের সিস্থিশীলতা ও বিকাশের স্বার্থে নিরলস কাজ করে গেছে। পুরুষতন্ত্র নানানভাবে এই অন্যায়কে বৈধকরণ করেছে। পুরুষতন্ত্রের সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নারী নিজেই কখনও কখনও তার উপর চাপিয়ে দেয়া অন্যায়ের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নারী হয়ে উঠেছে নারী নির্যাতক। কারণ আত্মত্যাগের বিনিময়ে শান্তি বজায় রাখাকেই সে সভ্যতার রক্ষাকবচ বলে ভেবেছে।
কিন্তু বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস সমপূর্ণ ভিন্ন। এ সময় নারী দীর্ঘ নিরবতা ভেঙ্গে সোচ্চার হয়ে উঠে। নারীর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন রকম অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবীতে একের পর এক রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে প্রকম্পিত হয় বিশ্ব। শিক্ষা,সমপত্তি,কাজের সুযোগ,শ্রমবাজারে নারীর অবস্থান,নারীর প্রতি সমাজের মনোভাব পরিবর্তনের লক্ষ্যে পৃথিবীর দেশে দেশে নারীরা জেগে উঠেন। ভারতবর্ষ ও আজকের বাংলাদেশেও নারী জাগরণের ঢেউ এসে লাগে।
গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকেই এদেশের নারীরা জেগে উঠতে শুরু করে। জাতীয় রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশগ্রহণের পাশাপাশি নারীরা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবীগুলোকেও সামনে তুলে ধরে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে এদেশের নারীরা অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করে। নবগঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রে নারী অধিকারের বিষয়টি রাষ্ট্র-সরকারের কাছেও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। ১৯৭২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী সরকারের এক আদেশবলে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ মহিলা সমিতি। এর বাইরেও নানারকম সংঘ,সমিতি,সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে নারীরা তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন অব্যাহত রাখে।
বিশ শতকের নারী জাগরণ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতারই একটি প্রবাহ ‘বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক’। বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক কার্যক্রম শুরু করে ২০০৬ সালে। দেশের তৃণমূলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট সক্রিয় নারী সংগঠন এবং ব্যক্তি নারীনেত্রীদের জন্য একটি সেতুবন্ধন গড়ে তোলাই ছিল এর প্রাথমিক লক্ষ্য। যাতে করে তৃণমূলের নারীরা একটি জাতীয়ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিজেদের চিন্তা-চেতনা,দাবী-দাওয়া তুলে ধরতে পারেন। যাতে নারীদের একটি জাতীয়ভিত্তিক ঐক্য গড়ে উঠে,যাতে তাদের কন্ঠ উচ্চকিত হয়,যাতে তাদের অধিকারের কথা পৌঁছৈ দিতে পারেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে, যাতে তাদের কন্ঠ নারী জাগরণের বৈশ্বিক চেতনার সাথে একসুরে মিলতে পারে।
দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ সূচনালগ্ন থেকেই ক্ষুধামুক্ত,আত্মনির্ভরশীল, সামাজিক ন্যায় ও নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে গণজাগরণ সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়ে আসছে। স্থানীয় সরকার,তৃণমূলের নারী-পুরুষ,ছাত্রছাত্রীদের সংগঠিত,ক্ষমতায়িত ও অনুপ্রাণিত করার বহুমূখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। যাতে তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজের এলাকা পরিবর্তন ও উন্নয়নের দায়িত্ব নিজেরা গ্রহণ করে। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে ও তাদের নেতৃত্বে সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠবে।
দি হাঙ্গার প্রজেক্ট গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে,’নারীরাই ক্ষুধামুক্তির মূল চাবিকাঠি’। বিদ্যমান জেন্ডার অসমতা ও বৈষম্য; ক্ষুধামুক্ত ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায়। নারীকে অবদমিত রেখে টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেও দেখা যায়-
– নারী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতন ও দক্ষ হলে তাদের সন্তানরা শিক্ষার আলো পায়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যায়। পরিবারের আয় বাড়ে। নারীর উপর নির্যাতন,নিপীড়ন হ্রাস পায়। যৌতুকের দাবী কমে। মোট কথা,শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগের মাধ্যমে নারীদের এবং সাথে সাথে তাদের পরিবারের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যত সৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়ে।
– স্বাস্থ্য ও পুষ্টির মাধ্যমে নারীর স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা গেলে তারা সুস্থ ও বলিষ্ট সন্তান প্রসব করে থাকে। এতে পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস পায়। নারীরা বেশী উৎপাদনক্ষম হয়। তারা পরিবার তথা জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে।
– নারীদের  আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি  হলে পরিবারে এবং সমাজে তাদের মর্যাদা বেড়ে যায়। তারা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে। তাদের প্রতি অবিচার ও নির্যাতনের পরিমাণ কমে যায়। নারীর আয় সাধারণত পরিবারের কল্যাণে ব্যয় হয়। তাই নারীর বাড়তি আয়ের মাধ্যমে পরিবারের সার্বিক অবস্থার উন্নতি সাধিত হয়ে থাকে।
– নারীরা  যদি একতাবদ্ধ ও  সংগঠিত হয় তাহলে তারা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয় এবং অধিকার আদায়ের জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। তাদের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। আয় বৃদ্ধি করার নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। নারীরা সংগঠিত হওয়ার মাধ্যমে পারিবারিক এবং সামাজিক অনেক সমস্যা সমাধানে তারা অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।
– পরিবারে ও সমাজের ভিতরে নারী নির্যাতন, নারীর জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। তাই কোন নির্যাতনকে নারীরা বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দিবে না, প্রতিটি নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে  প্রতিবাদ করবে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। নির্যাতনের বিরুদ্ধে তারা হবে প্রতিবাদী। সেই সাথে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে নারী অধিকার রক্ষায় বিদ্যমান আইনের যথাযথ গ্রয়োগ ও বৈষম্যমূলক আইন সংশোধনের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এতে নারী নির্যাতন কমবে,পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি নিশ্চিত হবে,নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে,মানবাধিকার সংরক্ষণ হবে এবং জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

তাই জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠার চেতনাকে ধারণ করে নারী ক্ষমতায়িত, সংগঠিত ও অনুপ্রাণিত হলেই ক্ষুধামুক্ত ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। নারী নেতৃত্ব বিকাশ কার্যক্রম মূলত এই কাজটিই অব্যাহতভাবে করে চলেছে। ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে ৩ দিনের একটি ফাউন্ডেশন কোর্সের মধ্য দিয়ে নারী নেতৃত্ব বিকাশ কার্যক্রমের সূত্রপাত ঘটে। কার্যক্রমের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বলিষ্ঠ ও আত্মপ্রত্যয়ী নারী এই কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হয়েছে। যারা স্থানীয় পর্যায়ে ‘নারীনেত্রী’ হিসাবে স্বীকৃত।
ফাউন্ডেশন কোর্স পরবর্তী প্রতি মাসে দিনব্যপী ফলোআপ কর্মশালার মাধ্যমে নেত্রীদের সক্রিয়তা, নেতৃত্বের দক্ষতা ও সামর্থ্য বিকাশের নিয়মিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগ চলতে থাকে বছরব্যাপী। একইসাথে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নারী নেত্রীদের মধ্যে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খা তীব্র হতে থাকে এবং গড়ে উঠে গভীর আন্ত:সম্পর্ক। এরই ধারাবাহিকতায় ৬ এপ্রিল ২০০৭ এ সাড়াদেশের নারীনেত্রীরা প্রথম জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করে। আর সম্মেলনের মধ্য দিয়েই এই নেটওয়ার্কের আত্নপ্রকাশ ঘটে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s