Select Page

আমরা, তৃণমূলের সহস্রাধিক নারী সংগঠক, যারা দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর সহায়তায় সৃষ্ট ‘বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর সদস্য, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আজ ৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে সমবেত হয়েছি। আমরা নিজ এলাকায় আমাদের ও স্থানীয় জনগণের জীবনমানের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছি। আমরা আজ এখানে একত্রিত হয়েছি এ সফলতাগুলো উদযাপন, আমাদের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে।

আমরা জানি যে, প্রসূতি মা ও নবজাতক শিশুর মৃত্যুহার কমানো, টিকাদান-সহ শিশুদের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ এবং তাদের সার্বিক জীবনমানের উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি যথেষ্ট ইতিবাচক। কিন্তু একইসঙ্গে আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, সারাদেশে নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সুযোগ ও মৌলিক সেবা গ্রহণে নারীদের অভিগম্যতা ও সম-অংশগ্রহণের সুযোগ এখনও সীমিত। আমরা এ সকল অন্যায্য ও অনাকাক্সিক্ষত অবস্থার অবসানের লক্ষ্যে এবং নারী তথা সকল নাগরিকের জন্য সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে বদ্ধপরিকর।

আমরা এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, যেখানে সমাজের প্রতিটি স্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় থাকবে নারীর অন্তর্ভুক্তি ও সম-অংশগ্রহণ। আমরা চাই, সকলের জীবন হবে নিরাপদ। আমরা বিশ্বাস করি, নারীদের সচেতন, সক্রিয় ও সংগঠিত করে তাদের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা ও সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে আমাদের বহুল প্রত্যাশিত আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যৎ অর্জন করা সম্ভব। এই প্রত্যাশাকে ধারণ করে, তৃণমূলে নারী নেতৃত্ব বিকাশের মাধ্যমে আমরা যে গণজাগরণ সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছি, তা বেগবান করার লক্ষ্যে এই সম্মেলন থেকে আমরা কতগুলো কর্মসূচি স্বেচ্ছায় বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করছি।

আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করছি যে,

এক. ‘বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর একজন একনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে আমরা প্রত্যেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে নিজেদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও অন্তর্নিহিত শক্তির সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটাবো, যাতে ক্ষুধামুক্ত ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনে আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়ে ওঠতে পারি;

দুই. সমমনা অন্য নারীদের সংগঠিত করবো এবং তাদের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করবো, যাতে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ককে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা যায়;

তিন. স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সকল স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। সকল স্তরের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে নিজেদেরকে প্রস্তুত করে তুলবো। একইসঙ্গে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নিবাচনের মাধ্যমে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীগণ যাতে নির্বাচিত হন, সে লক্ষ্যে জনগণ, বিশেষত নারীদের সংগঠিত ও  উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবো;

চার. আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে বাল্যবিবাহ, যৌতুক, নারী ও শিশুপাচার এবং পারিবারিক নির্যাতন-সহ নারীর প্রতি সকল সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো;

পাঁচ. ক্ষুধা-দারিদ্র্যের অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন, মা ও শিশু-সহ সবার পুষ্টির উন্নয়ন, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবো;

ছয়. সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি ও মৌলিক সেবায় নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা নিশ্চিতকল্পে ইউনিয়ন পরিষদ-সহ অন্যান্য সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহকে দায়বদ্ধ করার জোরালো প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো;

সাত. সার্বিক জীবনমান উন্নয়নে স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ও নিরাপদ পানি, গর্ভবতী নারীর যত্ন ও নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রতিটি শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তি, জন্ম ও বিবাহনিবন্ধন, আত্মকর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ, নারী শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য দূরীকরণ এবং মাদক ও জঙ্গিবাদের মতো ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা দূরীকরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবো;

আট. ‘কন্যাশিশু বোঝা নয়, বরং সম্পদ’-এ বোধ গড়ে তোলার ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবো, যাতে করে জন্মের পর থেকেই কন্যাশিশ্রু সকল সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত হয়। একইসঙ্গে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া রোধ করা-সহ কন্যাশিশুর সকল অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের প্রতিভা বিকাশের সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলবো;

নয়. পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ অভিঘাত থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে নারীর অসামান্য ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদানের দাবি জানাবো ও সামাজিক গণজাগরণ গড়ে তুলবো;

দশ. বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর সদস্য হিসেবে আমরা নিজ নিজ এলাকায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসসমূহ উদ্যাপনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবো। বিশেষত আন্তর্জাতিক নারী দিবস, জাতীয় কন্যাশিশু দিবস, আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস, বিশ্ব মানবাধিকার দিবস ও বেগম রোকেয়া দিবস অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করবো।

পরিশেষে, আজকের এ সম্মেলন থেকে আমরা দীপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করছি যে, সকল প্রকার বৈষম্য-নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে মুক্ত একটি মানবিক মর্যাদার সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবো।