Select Page

নির্যাতন-বঞ্চনা-বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়া এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনের অঙ্গীকার গ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলো বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর অষ্টম জাতীয় সম্মেলন-২০২৩। ০৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে রাজধানী ঢাকার কাকরাইলে অবস্থিত ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের সোশ্যাল গার্ডেন হল রুমে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
‘নারীরাই ক্ষুধামুক্তির মূল চাবিকাঠি’- এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে সম্মেলনে তৃণমূলের প্রায় এক হাজার নারীনেত্রী ও সংগঠক অংশগ্রহণ করেন। তারা নিজ নিজ এলাকায়, বিশেষ করে নারীদের জীবনমানের উন্নয়নে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন এবং এর মাধ্যমে যে সফলতা এসেছে তা উদ্যাপন, সংগ্রামের অভিজ্ঞতাগুলো বিনিময় এবং একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নির্ধারণ করেন এ সম্মেলনে।

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. রওনক জাহান, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. বদিউল আলম মজুমদার, মানবাধিকারকর্মী ড. হামিদা হোসেন, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ-এর পরিচালক (কর্মসূচি) নাছিমা আক্তার জলি এবং নারী উদ্যোক্তা ও সংগঠক তাজিমা হোসেন মজুমদার।

সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট রাশিদা আক্তার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন নারীনেত্রী অ্যাডভোকেট পারভীন আহমেদ এবং নারীনেত্রী রুখসানা জামান শানু। অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার দিলীপ কুমার সরকার এবং প্রোগ্রাম অফিসার শাহীনা আক্তার। সম্মেলনে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক টাঙ্গাইল জেলা কমিটির সভাপতি আঞ্জু আনোয়ারা ময়না।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাব্রতী সংস্থা দি হাঙ্গার প্রজেক্ট একটি আত্মনির্ভরশীল, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বিগত তিন দশক ধরে সারাদেশে নানাবিধ কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো নারীর নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি। এই কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে সারাদেশে প্রায় দশ হাজার স্বেচ্ছাব্রতী নারীনেত্রী তৈরি হয়েছে, যাঁরা নিজেদের উন্নয়নের জীবনমানের উন্নয়নের পাশপাাশি নিজ কর্ম-এলাকায় এসডিজির অভীষ্ট অর্জনের লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন করছেন, স্থানীয় সম্পদ ও সংগঠনকে কাজে লাগিয়ে এবং তাদের অনুঘটকসুলভ নেতৃত্বের মাধ্যমে অসংখ্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন, যা জাতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

সকাল ১০.০০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শুরু হয়। এরপর সম্মিলিত কণ্ঠে ‘আগুনের পরশমনি’ গানের সঙ্গে সঙ্গে মিলনায়তনে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন উপস্থিত নারীনেত্রীগণ।

জাতীয় সংগীত ও উদ্বোধনী সংগীতের পর ‘উইমেন অ্যাডভোকেটস ফর ইক্যুয়াল রাইটস’ প্রকল্পভুক্ত নারীনেত্রীদের কার্যক্রম নিয়ে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার আহসানুল কবির নির্মিত একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয়। উল্লেখ্য, জার্মান দূতাবাসের সহায়তায় ও দি হাঙ্গার প্রজেক্ট পরিচালিত উক্ত প্রকল্পের অধীনে রংপুর ও নীলফামারী জেলার ১৪টি ইউনিয়নে মোট ২৫২ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল তৃণমূলে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা কমিয়ে আনা, নারী ও শিশুদের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা করা এবং তাদের সঠিক আইনগত সহায়তা দেওয়া, এ লক্ষ্যে নেটওয়ার্কিং ও অ্যাডভোকেসির জন্য একদল মানবাধিকারকর্মী গড়ে তোলা।

সম্মেলনে শোক প্রস্তাব পাঠক করেন বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক বরিশাল জেলা কমিটির সদস্য তানজিলা জেরিন অমি। সাংগঠনিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সম্পদক জনাব নাছিমা আক্তার জলি। এরপর দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর দশটি অঞ্চল থেকে দশজন নারীনেত্রী নিজ নিজ অঞ্চলের কার্যক্রমের বিবরণ ও সফলতা তুলে ধরেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপস্থিত নারীনেত্রীদের উদ্দেশ্যে ড. রওনক জাহান বলেন, ‘আপনাদের দেখে আমি উজ্জীবিত। আপনারা নিজেদের ‘নেত্রী’ বলে সম্বোধন করেছেন দেখে আপনার খুব ভালো লেগেছে। মেয়েদের, নারীদের মধ্যে যে একটা আত্মবিশ্বাস থাকতে হয়- সেটা নিজেদের নেত্রী বলার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়। আপনাদের দেওয়া স্লোগানগুলোও আমার খুব ভালো লেগেছে। আপনাদের এই আনন্দমেলায় আসতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।’

তিনি বলেন, ‘আমি বহু বছর ধরে বিভিন্ন নারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। সত্তরের দশকে তখন চিন্তাই করতে পারতাম না এত নারী তৃণমূল থেকে কোনো একটা নারী সম্মেলনে যোগ দেবেন। আজকের এই সম্মেলন প্রমাণ করে যে বর্তমানে নারীরা অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য অনেক কিছুতে উন্নতি করেছে। যদিও কিছু সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। তার মধ্যে একটি হলো এখনো নারীকে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য সকলকে কাজ করতে হবে। তৃণমূলে আপনারা নিজেদের ও অন্য নারীদের উন্নয়নের আপনারা যে অসামান্য কাজ করছেন যেসজন্য আমি আপনাদেরকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। ’

উপস্থিত নারীনেত্রীদের উদ্দেশ্যে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আপনারা আপনাদের স্ফুলিঙ্গ দিয়ে অনেক নারীকে প্রজ্বলিত করেছেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক হতাশার কথা আমরা শুনি, আপনাদেরকে দেখলে হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। আপনারা হলেন বাংলাদেশের শক্তির উৎস। আত্মশক্তির উন্মেষ ঘটিয়ে সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনার জন্য আপনারা কাজ করছেন। আমি নিশ্চিত আপনাদের অবদান বাংলাদেশ একদিন স্মরণ করবে। আপনারা আমাকেও ভিন্ন এক মানুষে রূপান্তর ঘটিয়েছেন, তাই আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ।’

তিনি বলেন, ‘নারীর শক্তি, বাংলাদেশের শক্তি। তাই বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা নারীদের জাগিয়ে তুলব, নিজেদের পায়ে দাঁড়াব, তারা যেন সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে সেজন্য সব ধরনের সহায়তা করব। অর্থ-কড়ি দিয়ে না পারলেও তাদেরকে উৎসাহ দিয়ে, তাদের পাশে দাঁড়িয়ে, আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে আমরা তাদেরকে সহায়তা করব।’

ড. হামিদা হোসেন বলেন, ‘নারীরাও পারে- এ স্লোগানটি আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি মনে করি, নারীরা পারলে বাংলাদেশ পারবে।’

উপস্থিত নারীনেত্রীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, তৃণমূলে আপনাদের কাজের বিবরণ শুনে আমি অভিভূত ও আনন্দিত। ভবিষ্যতে আপনাদের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করতে চাই এবং আপনাদের কাজ দেখতে আপনাদের গ্রামে যেতে চাই। আমি আশা করি, ভবিষ্যতে আইনি সহায়তাদান-সহ আমরা একসঙ্গে অনেক কাজ করতে পারব।’

 

 

তাজিমা হোসেন মজুমদার বলেন, ‘নারীদেরকে স্বাবলম্বী হয়ে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া নারীদের চলার পথ সহজ হবে না। তাই নারীদেরকে অর্থনৈতিক মুক্তি আনতে হবে নিজেদের জন্য এবং সমাজের জন্য।’

 

 

 

 

আমন্ত্রিত অতিথিদের বক্তব্যের আগে সাংগঠনিক প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে নাছিমা আক্তার জলি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় এক হাজার নারীনেত্রী আজকের সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছেন। আলোকিত এই নারীরা আলোকবর্তিকা হাতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত এবং অন্যদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করছেন।’

আমন্ত্রিত অতিথিদের বক্তব্যের আগে স্বাগত বক্তব্যে সম্মেলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট রাশিদা আক্তার বলেন, ‘২০০৬ সাল থেকে হাঁটি-হাঁটি পা পা করে প্রশিক্ষিত দশ হাজার নারীনেত্রী নিয়ে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক আজকের এই পর্যায়ে এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ছয় হাজার নারীনেত্রী বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা-ে যুক্ত রয়েছেন, যারা নিজেদের অবস্থা ও অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পরই করোনা মহামারি শুরু হয়। কিন্তু আমাদের কোনো কার্যক্রম থেমে থাকেনি। করোনার সময় নারীনেত্রীরা অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘নারীরাই ক্ষুধামুক্তির মূল চাবিকাঠি- এই স্লোগানকে ধারণ করে আমাদের নারীনেত্রীরা তৃণমূলে এসডিজি বাস্তবায়নে কাজ করছেন। বিকশিত নারীরা শুধু নিজেরাই নারীনেত্রী হন না, তারা নিজেরাও নারীনেত্রী তৈরি করেন। কারণ তৃণমূলে নারীরা তৈরি হলে স্থানীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হয়। বিকশিত নারীনেত্রীগণ সেই কাজটিই দক্ষতার সঙ্গে করে চলেছেন।’
সাংগঠনিক প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে তিনি বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক কী এবং এটি গঠনের পটভূমি বর্ণনা করেন। তিনি জানান, ‘সারাদেশে ৯ হাজার ৮০০ জন নারীনেত্রী বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে জাতিসংঘের ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য-এসডিজি’ বাস্তবায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। বর্তমানে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর ১১৯টি ইউনিয়ন কমিটি, ৬৮টি উপজেলা কমিটি, ৫১টি জেলা কমিটি রয়েছে। এছাড়া রয়েছে ১টি করে জাতীয় কমিটি ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির একটি সভা এবং দশটি অঞ্চলে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর বিভিন্ন স্তরের ২৪৬টি কমিটির সভা হয়েছে। সভাগুলোতে প্রায় ৩ হাজার ৮৯০ জন নারীনেত্রী ছিলেন।’

নাছিমা আক্তার জলি বলেন, ‘সারাদেশে বিগত দুই বছরে (জানুয়ারি ২০২২-জুন ২০২৩) ১১টি ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ শীর্ষক বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ (ফাউন্ডেশন কোর্স) এবং নারীনেত্রীদের নিয়ে ৩৮৫টি ফলো-আপ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রশিক্ষিত নারীনেত্রীরা বর্তমানে তৃণমূলে বাল্যবিবাহ, যৌতুক, ইভটিজিং ও পারিবারিক নির্যাতন বন্ধ এবং শিশুর জন্মনিবন্ধন, স্যানিটেশন ও নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।’

তিনি তাঁর বক্তব্যে নারীনেত্রীদের সামাজিক উদ্যোগসমূহ এবং নারীনেত্রীদের অর্জন ও জয়িতা পুরস্কার প্রাপ্তি-সহ বিশেষ অর্জন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীনেত্রীগণের সাফল্য চিত্র, ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ কার্যক্রমের শিক্ষণীয় দিক, নেটওয়ার্কের কার্যক্রম পরিচালনার চ্যালেঞ্জসমূহ এবং নেটওয়ার্কের কার্যক্রম পরিচালনায় ভবিষ্যৎ করণীয় ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরেন।

নিজ নিজ অঞ্চলের পক্ষ থেকে অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্বে অংশগ্রহণ করেন নারীনেত্রী অ্যাডভোকেট মোসা. মোব্বাশিরিনা (গঙ্গাচড়া, রংপুর), হেলনাজ তাহেরা (সহ-সভাপতি, কক্সবাজার জেলা কমিটি, বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক), রেহানা আফরোজা শোভা (সভাপতি, খুলনা জেলা কমিটি ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি, বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক), রোকসানা আক্তার লিপি (মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান, গুরুদাসপুর উপজেলা পরিষদ ও সভাপতি, গুরুদাসপুর উপজেলা কমিটি, বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক), রীতা ব্রহ্ম (সদস্য, বরিশাল জেলা কমিটি, বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক), পারভীন আক্তার (ডুমুরিয়া উপজেলা কমিটির সদস্য, বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক, ঝিনাইদহ অঞ্চল) শাহানা হক (সভাপতি, কুমিল্লা জেলা কমিটি, বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক), লুৎফুন্নাহার (সভাপতি, ময়মনসিংহ জেলা কমিটি, বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক), ক্যামেলিয়া চৌধুরী (সহ-সভাপতি, ঢাকা জেলা কমিটি, বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক), রোমেনা আক্তার (সভাপতি, সুনামগঞ্জ জেলা কমিটি, বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক)।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের পক্ষ থেকে নারীনেত্রী হেলনাজ তাহেরা বলেন, ‘আত্মশক্তিতে বলীয়ান কখনও দরিদ্র থাকতে পারে না’- সেই ২০০৪ সালের মার্চ থেকে এই কথাটা মনে ধারণ করে, লালন করে আমি আজ এই পর্যায়ে এসেছি। আমি দুইবার নির্বাচিত কাউন্সিলর, এরপর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেছি। আমি মনে করি, জীবনে এগিয়ে যেতে হতে হলে সাহস, শক্তি, মনোবল, বিশ্বাস ও আত্মশক্তিতে বলীয়ান হতে হবে। এছাড়া দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না করলে আমরা দেশটাকে পরিবর্তন করতে পারব না।’

তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে আগে বাল্যবিবাহ বেশি হতো। কিন্তু নানান প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আমরা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সক্ষম হয়েছি। ইভটিজিং প্রতিরোধের জন্য আমরা স্কুলে স্কুলে ছাত্রদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি, মা সমাবেশ করেছি। আমরা মনে করি, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন কারও একার স্বপ্ন নয়, বরং সবার স্বপ্ন হতে হবে, সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই একসঙ্গে কাজ করলেই আমরা ক্ষুধামুক্ত ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নারীনেত্রীরা কক্সবাজারে বয়স্কদের জন্য স্কুল গড়ে তুলেছি, নিরক্ষর অনেক নারীকে স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করে তুলেছি। আমরা হতদরিদ্র নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি এবং সদর উপজেলা পরিষদ থেকে তাদেরকে সেলাই মেশিন দিয়েছি। আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে চাই। আমরা নারীরা মানুষ হিসেবে পরিচিতি পেতে চাই।’
খুলনা অঞ্চলের পক্ষ থেকে নারীনেত্রী রেহানা আফরোজা শোভা বলেন, ‘২০২৩ সালে আমাদের খুলনা অঞ্চলের ৩০০ নারীনেত্রী আয়মুখী কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আয়মুখী কাজের মধ্যে রয়েছে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি লালন-পালন, শাক-সবজি চাষ, মৎস চাষ এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প পরিচালনা। এ সময় বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয়েছে ১০৯টি, ৪৮ জন ছাত্রীকে পুনরায় বিদ্যালয়গামী করা হয়েছে, সালিশীর মাধ্যমে ৪৪ জন নারীকে পারিবারিক নির্যাতন থেকে রক্ষা করা হয়েছে, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে হাত ধোয়া ও যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য (ঝজঐজ) সম্পর্কে ২০৯টি উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। আমাদের নারীনেত্রীদের অনেকে জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন। আমরা বিভিন্ন দিবস পালনেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করি।’

তিনি বলেন, ‘খুলনা অঞ্চলের ৫৪ জন নারীনেত্রী ইউনিয়ন পরিষদের স্থায়ী কমিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সঙ্গে যুক্ত আছেন ১৮ জন নারীনেত্রী। নারীনেত্রীদের উদ্যোগে ৩৬টি গণগবেষণা সমিতি পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন গ্রাম উন্নয়ন দলে (ভিডিটি) নারীনেত্রীরা সক্রিয় রয়েছেন। খুলনা অঞ্চলের ১২৯ জন নারীনেত্রী জেলা পরিষদের সদস্য, ২১৯ জন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য এবং ৪ জন উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। খুলনা অঞ্চলের নারীনেত্রীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা আর পিছিয়ে নেই।’

রাজশাহী অঞ্চলের পক্ষ থেকে নারীনেত্রী রোকসানা আক্তার লিপি বলেন, ‘আমরা রাজশাহী অঞ্চলের নারীরা বিল্পবী নারী ইলা মিত্রের উত্তরসূরী। আমরা বরেন্দ্র অঞ্চলকে রাঙিয়ে তুলেছি, সাজিয়ে তুলেছি, পরিচ্ছন্ন করে তুলেছি। আমাদের জয়গানের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সন্তানেরাও আজ সফলতার মুখ দেখছে। গ্রামে গ্রামে ক্ষুদ্র সঞ্চয় গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে আমরা বৃহৎ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের দিকে ধাবিত হচ্ছি। তথ্য-প্রযুক্তি ও আয় বৃদ্ধিমূলক বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে নারীরা আজ স্বাবলম্বী। আমাদের নারীনেত্রীরা ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদে নেতৃত্ব দিচ্ছে। রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কমিটিতে আজ নারীনেত্রীদের পদচারণা। আজ আমরা অধিকার সচেতন।’

তিনি বলেন, ‘বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও নারী নির্যাতনের আমরা আজ সোচ্চার। করোনার মতো মহামারিকে আমরা জয় করেছি। নিরাপদ খাদ্য আন্দোলনে আমাদের নারীনেত্রীরা আজ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ফলে আজ নাটোর, রাজশাহী ও নওগাঁর ঘরে ঘরে নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। গর্ভবতী নারীদের জন্য আমরা এমএমএস সার্ভিস চালু করেছি। আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজি ও প্রয়াস আজ বৃহত্তর সামাজিক পুঁজিতে পরিণত হয়েছে। আমরা গুরুদাসপুরে তৃতীয় লিঙ্গের নারীদের প্রশিক্ষিত করেছি। তাদের মধ্যে একজন দেওয়ান নদী আজ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।’

বরিশাল অঞ্চলের পক্ষ থেকে নারীনেত্রী রীতা ব্রহ্ম বলেন, ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর নারীনেত্রী হিসেবে আমরা বরিশালের নারীনেত্রীরা সামাজিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য আমরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছি। আমরা বাল্যবিবাহমুক্ত ও ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছি। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য (ঝজঐজ) সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমরা কাজ করছি। সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে আমাদের অঞ্চলে বর্তমানে বাল্যবিবাহ প্রায় শূন্যের কোঠায়। ইভটিজিংও অনেক কমে এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘২০১৩ সালে আমি ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ পাই। তখন আমি আজকের রিতা ব্রহ্ম ছিলাম না, আমি ছিলাম একজন সাধারণ গৃহিণী। আমার তখন কথা বলার ভাষা ছিল না। ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ প্রশিক্ষণ পেয়ে আমি আমার জীবন পরিবর্তন করতে পেরেছি, আমি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছি। এখন আমাকে অনেকেই চেনেন। কুড়িগ্রাম থেকে চরফ্যাশন পর্যন্ত আমাদের একটি কৃষক সংগঠন রয়েছে, যে সমিতির সদস্য সংখ্যা প্রায় দশ হাজার। আমি এই সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমি সংগঠনের বিভিন্ন কমিটিতে নারীদের যুক্ত করেছি এবং সংগঠনের নেতৃত্বদানের কারণে আমার বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। আমি চাই, আমাদের নারীরা নেতৃত্বদানে এগিয়ে আসুক।’

খুলনা অঞ্চলের পক্ষ থেকে নারীনেত্রী পারভীন আক্তার বলেন, ‘আমি একজন সাধারণ নারী ছিলাম। কিন্তু দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর প্রশিক্ষণ আমার জীবন পরিবর্তন করে দিয়েছে। আমি ‘শলুয়া নিমতলা গণগবেষণা সমিতি’-সহ অনেকগুলো সমিতি গড়ে তুলেছি। আমি নারীদের সঙ্গে নিয়ে বনায়ন করেছি, কৃষাণী সংগঠন গড়ে তুলেছি। আমি অনেক এনজিও’র সঙ্গে কাজ করলেও দি হাঙ্গার প্রচেক্ট-এর মতো ব্যতিক্রমধর্মী কর্মকা- আমি কোথাও দেখিনি। তাই আমি দি হাঙ্গার প্রজেক্টকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।’

তিনি বলেন, ‘করোনার সময় আমরা নারীনেত্রীরা স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরিতে ব্যাপকভাবে কাজ করেছি এবং দরিদ্র মানুষকে আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা দিয়েছি। আমরা অনেক বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি, ইভটিজিংয়ের বিভিন্ন ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছি, অনেক ঝরে পড়া শিশুকে আবার বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে পেরেছি। সামাজিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আমি দু’বার জয়িতা পুরস্কার পেয়েছি এবং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছি।’

কুমিল্লা অঞ্চলের পক্ষ থেকে নারীনেত্রী শাহানা হক বলেন, ‘বিগত সম্মেলনের পর থেকে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও দি হাঙ্গার প্রজেক্ট এবং আমাদের নিজেদের উদ্যোগে আমরা অনেক কাজ করতে পেরেছি। যেমন, করোনার সময় আমরা প্রায় ৩ হাজার মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করে তুলতে পেরেছি, প্রায় ২০০ জনকে আমরা খাদ্য সহায়তা দিতে পেরেছি। পাঁচটি জেলা, চারটি ইউনিয়ন, পাঁচটি উপজেলায় আমরা নতুন করে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর কমিটি গঠন করেছি। বিদ্যালয়ে ভর্তিকরণ বিষয়ক ১৯টি উঠান বৈঠক আয়োজন করে ৫১০ জন শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে পেরেছি। জন্মনিবন্ধন বিষয়ক ১৬৪টি, বাল্যবিবাহ বিষয়ক ১১০টি, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবার্তা বিষয়ক ৮৮টি, পারিবারিক সহিংসতা বিষয়ক ৭৯টি এবং যৌতুক বিষয়ক ১১৮টি উঠান বৈঠকের আয়োজন করেছি। ১০৬টি যৌতুকবিহীন বিয়ের আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছি। এসব কাজের মধ্য দিয়ে আমরা তৃণমূলে এসডিজির অভীষ্ট অর্জন করে চলেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমি দি হাঙ্গার প্রজেক্টকে ধন্যবাদ জানাই। এই সংস্থার মাধ্যমেই আমরা বিকশিত হয়েছি। একদিন যে নারী ঘর থেকে বের হতে পারেনি, আজকে তারাই দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে আজকের সম্মেলনে যোগদান করেছেন। দি হাঙ্গার প্রজেক্ট ও বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক আজ আমাদের প্রাণের সংগঠনে পরিণত হয়েছে।’

ময়মনসিংহ অঞ্চলের পক্ষ থেকে নারীনেত্রী লুৎফুন্নাহার বলেন, ‘ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে আমরা যারা আজকের এই সম্মেলনে যুক্ত হয়েছি তারা একেকজন যোদ্ধা। করোনা শুরুর পর থেকে আমরা এখন পর্যন্ত তিন শতাধিক বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছি, দুই শতাধিক শিশুর বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধ করেছি। ২ হাজার ১৮ জন শিশুর জন্মনিবন্ধন, প্রায় দেড় হাজার নারীর নিরাপদ সন্তান প্রসব ও ১৫০ জন নারীর যৌতুকমুক্ত বিবাহ আয়োজনে আমরা সহযোগিতা করেছি। আমরা নারীনেত্রীরা চার শতাধিক গণগবেষণা সমিতি গড়ে তোলে প্রায় দুই কোটি টাকা সঞ্চয় করতে পেরেছি। সমিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৃণমূলের নারীরা স্বাবলম্বী হয়ে বর্তমানে ভালোভাবে দিনানিপাত করছে। আমি মনে করি, আগামীর ক্ষুধামুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের জন্য আমাদেরকে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’

রংপুর অঞ্চলের পক্ষ থেকে নারীনেত্রী অ্যাডভোকেট মোসা. মোব্বাশিরিনা বলেন, ‘বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, “কোনোকালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারী, প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষী নারী।” যে নারীর হাত দিয়ে রচিত হয়েছিল সভ্যতার বীজ, তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্ব এগিয়ে গেছে, দেশ এগিয়ে গেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আজকের এই সম্মেলন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।’

তিনি বলেন, ‘আমরা নারীরা অধিকার ও মর্যাদার লড়াই করে আজকের পর্যায়ে আসতে পেরেছি। আজকের এই শুভক্ষণে সকলকে আহ্বান জানাতে চাই, নারীর অধিকার কারো দান বা দয়া নয়, নারীর অধিকার হচ্ছে মানুষ হিসেবে তার জন্মগত অধিকার। তাই আমরা আমাদের অধিকার কীভাবে অর্জন করব তা জানতে হবে এবং কাজ করতে হবে।’

সিলেট অঞ্চলের পক্ষ থেকে নারীনেত্রী রোমেনা আক্তার বলেন, ‘আমাদের নারীনেত্রীরা ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ নিয়ে আমাদের অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। আমাদের নারীনেত্রী হাঁস-মুরগি ও গুরুর খামার গড়ে তুলেছেন। নারীনেত্রীরা সমাজের অন্য নারীদেরও সচেতন করে তুলছেন। করোনাকালীন ও বন্যার সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি আমরা নারীনেত্রীরা। আমরা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধ ও দরিদ্র মেয়েদের উপবৃত্তি পেতে সহায়তা করি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা নারী, সব পারি। আজকে বিমান পরিচালনা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই নারীরা যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব করে যাচ্ছে। আমরা মা, আমরা ঘরের কাজও পারি, বাইরের কাজও পারি। আমি নিজে একটি আলিয়া মাদরাসার শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব করছি। দি হাঙ্গার প্রজেক্ট আমাদের যা শিখিয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। বর্তমানে যেখানেই যাই, আমরা সম্মান পাই।’

ঢাকা অঞ্চলের পক্ষ থেকে নারীনেত্রী ক্যামেলিয়া চৌধুরী বলেন, ‘নারীরা আজকে আমরা যারা এখানে এসেছি তারা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করেই এখানে এসেছি। আমি খুবই রক্ষণশীল পরিবারের সন্তান ছিলাম। আমি যখন লেখাপড়া করতাম, তখন আমার বাবা বলতেন তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতে পারবা, কিন্তু চাকরি করতে পারবা না, তোমাকে সংসার করতে হবে। তখন আমি বাবাকে প্রশ্ন করতাম, ‘তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কী দরকার? ইন্টারমিডিয়েট পড়লেই তো হলো!’ তখন তিনি বললেন, ‘তুমি তোমার নিজেকে তৈরি করার জন্য, জ্ঞান আহরণের জন্য, তোমার সমাজের নানান প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করার জন্য তুমি লেখাপড়া করবেন। ভবিষ্যতে তোমাকে যাতে কেউ ছোট করে না দেখে সেজন্য তুমি লেখাপড়া করবে।’ বাবার এই কথার ৫০ শতাংশ আমি গ্রহণ করেছি, কিছুটা গ্রহণ করতে পারিনি। যেটুকু আমি গ্রহণ করতে পারিনি, সেখান থেকে আজকের আমি এখানের আমি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের নারীনেত্রীরা যারা তৃণমূল থেকে এখানে এসেছেন তাদেরকে আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। কারণ তারা যেখানে যে অবস্থানেই থাকুন না কেন তারা নিজেদের ও সমাজের পরিবর্তনে তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আসলে শিক্ষাগত জ্ঞানই মূল নয়, মানুষের সহজাত কিছু জ্ঞান থাকে। সেটাকে কাজে লাগিয়েও মানুষ অনেক কিছু করতে পারে। পৃথিবীতে যাঁরা বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন তাঁদের সবার কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না।’
আলোচনা পর্বের সমাপ্তি ঘোষণা করে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট রাশিদা আক্তার। এরপর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের নেত্রীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। নারীনেত্রীরা সঙ্গীত, নৃত্য এবং কবিতার মাধ্যমে তাদের নিজ নিজ এলাকার ঐতিহ্য সবার সামনে তুলে ধরেন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে দুপুর ১:৪৫টায় বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের ২০২০-২০২২ সালের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির নেতৃবৃন্দ আসন গ্রহণ করেন। সম্মেলনের অতিথিবৃন্দ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির নেতৃবৃন্দকে তাদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন। এরপর বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের সভাপতি অ্যাডভোকেট রাশিদা আক্তার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। সম্মেলনের শেষ পর্বে দুপুর ২.০০টায় বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর নবনির্বাচিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির (২০২৩-২০২৬) নেতৃবৃন্দকে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নেন বিলুপ্ত ঘোষিত কমিটির সদস্যগণ। এরপর নব-নির্বাচিত সভাপতি নারীনেত্রী জাহান পান্না তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেন।

উল্লেখ্য, সম্মেলনের আগে ০৬ অক্টোবর, ২০২৩ তারিখে রাজধানী ঢাকার আদাবরে অবস্থিত পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে ‘বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক’-এর কেন্দ্রীয় কার্যনিবাহী কমিটি গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠন পরিচালনার মূলনীতি অনুযায়ী উক্ত সভায় ২০২৩-২০২৬ সালের জন্য বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের কেন্দ্রীয় কার্যনিবাহী কমিটি গঠন করা হয়। সম্মেলনে উক্ত কমিটিকে অনুমোদন দেওয়া হয়। কমিটির তালিকা নি¤œরূপ:
১. সভাপতি, জাহান পান্না, রাজশাহী, রাজশাহী অঞ্চল
২. সহ-সভাপতি, হেলেনাজ তাহেরা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম অঞ্চল
৩. সম্পদক, নাছিমা আক্তার জলি, সচিবালয়, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট
৪. সহ-সম্পদক, শাহানা হক, কুমিল্লা অঞ্চল
৫. কোষাধ্যক্ষ, শামসী আরা জামান কলি, রংপুর, রংপুর অঞ্চল

৬. নির্বাহী সদস্য ছয়জন:
১. আফরোজা ইসলাম মিষ্টি (কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ অঞ্চল);
২. আনোয়ারা রাজ্জাক (মাদারীপুর, বরিশাল অঞ্চল);
৩. ক্যামেলিয়া চৌধুরী (ঢাকা, ঢাকা অঞ্চল);
৪. লক্ষী সরকার (গোপালগঞ্জ, খুলনা অঞ্চল);
৫. হেনা বেগম (সিলেট, সিলেট অঞ্চল);
৬. হাসিনা হায়দার চামেলী, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ অঞ্চল।

সম্মেলন প্রাঙ্গণে দেশের দশটি অঞ্চল থেকে আগত বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের নারীনেত্রীরা তাদের অঞ্চলভিত্তিক কার্যক্রম ডিসপ্লে বোর্ডের মাধ্যমে প্রদর্শন করেন। অনুষ্ঠানের শেষভাগে র‌্যাফল ড্র-তে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
অষ্টম জাতীয় সম্মেলনের দিন সকালবেলা থেকেই সকল নারীনেত্রীদের মুখে ছিল হাসি-আনন্দ, একইসঙ্গে বক্তব্য আর অনুভূতি ব্যক্ত করার ক্ষেত্রেও ছিল দৃঢ় মানসিক অঙ্গীকার। সকালের সেই স্নিগ্ধ হাসি ম্লান হয়ে যায়নি সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে, তথা পড়ন্ত দুপুরেও। আনন্দ-উল্লাস-উদ্যাপন, ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর এবং সম্মিলিত কণ্ঠে ‘আমরা করবো জয়’ গানের মধ্য দিয়ে নারীর জন্য বৈষম্যমুক্ত ও সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার গ্রহণের মধ্য দিয়েই শেষ হয় তৃণমূলের নারীনেত্রীদের এই মিলনমেলার।

প্রতিবেদন প্রণয়নে: নেসার আমিন, সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ।

সম্মেলনের মঞ্চে উপবিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ
প্রজ্জ্বলিত মোমবাতি হাতে সম্মেলনে উপস্থিত নারীনেত্রীবৃন্দ
নারীনেত্রীদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
নব-নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের ফুল দিয়ে বরণ
নব-নির্বাচিত সভাপতি নারীনেত্রী জাহান পান্নাকে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নিচ্ছেন বিদায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট রাশিদা আক্তার
শোক প্রস্তাব পাঠক করছেন বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক বরিশাল জেলা কমিটির সদস্য তানজিলা জেরিন অমি
ঘোষণাপত্র পাঠ করছেন বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক টাঙ্গাইল জেলা কমিটির সভাপতি আঞ্জু আনোয়ারা ময়না